টেকভিশন২৪ ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি এখন আর কেবল ইমেইল লেখা, ছবি তৈরি করা কিংবা সাধারণ চ্যাটবট পরিচালনার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। গবেষকেরা এখন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অমীমাংসিত ইতিহাসের গোপন রহস্য উন্মোচনে এআই-কে ব্যবহার করছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতিহাসবিদ এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির সাহায্যে মধ্যযুগীয় কূটনৈতিক চিঠিপত্র, হারিয়ে যাওয়া প্রেমের লিপি এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শত বছরের পুরোনো গোপন নথিপত্র সফলভাবে ডিকোড বা অনুবাদ করছেন, যা মানুষের পক্ষে পড়া এক প্রকার অসম্ভব ছিল।
বহু প্রাচীন নথিপত্র কালক্রমে মলিন, অসম্পূর্ণ, ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা এমন এক হাতের লেখায় লেখা হয়েছে যা আধুনিক গবেষকদের পক্ষে সহজে বোঝা সম্ভব নয়। এই জটিলতা দূর করতে গবেষকেরা হাজার হাজার ঐতিহাসিক নথি দিয়ে এআই মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এর ফলে এআই নির্দিষ্ট যুগের লিপিকারদের লেখার ধরন, বানানরীতি এবং ভাষার বিবর্তন নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করতে পারছে।
একবার প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর এই এআই অবিকল একজন ঐতিহাসিক গোয়েন্দার মতো কাজ করছে; এটি ঝাপসা হয়ে যাওয়া লেখা স্পষ্ট করতে পারছে, নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশের নিখোঁজ শব্দ পুনরুদ্ধার করছে এবং আংশিক ধ্বংস হয়ে যাওয়া পাঠ্যের সম্ভাব্য অর্থ কী হতে পারে তা নিখুঁতভাবে অনুমান করতে পারছে।
ইউরোপের বিভিন্ন লাইব্রেরি ও জাদুঘরগুলোতে বর্তমানে কোটি কোটি হাতে লেখা প্রাচীন পৃষ্ঠা রয়েছে, যা বিশাল আয়তনের কারণে মানুষের পক্ষে ম্যানুয়ালি পড়ে ডিজিটালাইজ বা অনুবাদ করা সম্ভব হয়নি। এআই-এর আগমন এই কাজকে বহুগুণ সহজ করে দিয়েছে। বিশেষ করে প্রাচীন কালির অবশেষ, জলছাপ বা পানির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কাগজ কিংবা অদ্ভুত সব লিখন পদ্ধতি—যা প্রচলিত উপায়ে পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব ছিল, তা এখন মেশিন লার্নিং মডেলের মাধ্যমে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পুনর্গঠন করা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তির প্রভাব কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কৌতূহলের চেয়েও অনেক গভীরে। ঐতিহাসিক আর্কাইভগুলো মূলত একটি সমাজের রাজনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম ও বিজ্ঞান বোঝার ভিত্তি তৈরি করে। এআই-এর এই সহায়তার ফলে যে আবিষ্কারগুলো করতে আগে গবেষকদের কয়েক দশক লেগে যেত, তা এখন মাত্র কয়েক দিনেই সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। একই সাথে এটি বিরল ভাষা বা প্রাচীন লিপিবিদ্যায় অপ্রশিক্ষিত সাধারণ মানুষের জন্য ইন্টারনেটে প্রাচীন ইতিহাস খোঁজা এবং তা জানার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
তবে এই অভাবনীয় সাফল্যের পরও ইতিহাসবিদেরা এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক। কারণ এআই মডেলগুলো অনেক সময় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ভুল বুঝতে পারে, শব্দের ভুল অনুবাদ করতে পারে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত টেক্সট পুনর্গঠনের সময় নিজস্ব মনগড়া তথ্য যুক্ত করে দিতে পারে। তাই গবেষকেরা এখনই এআই-কে মানুষের বিকল্প ভাবছেন না, বরং একে ইতিহাস চর্চার এক অত্যন্ত দক্ষ ‘সহকারী’ হিসেবে দেখছেন। আগামী কয়েক বছরে এই প্রযুক্তির পরিধি আরও দ্রুত বাড়বে এবং এর মাধ্যমে হয়তো পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া কোনো ভাষার রহস্য উন্মোচন বা ইতিহাসের এমন কোনো অজানা গল্প বেরিয়ে আসবে যা মানুষ একা কখনো খুঁজে পেত না।


