টেকভিশন২৪ ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রযুক্তিপ্রেমী ও তরুণ প্রজন্মের কাছে আইফোনের জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। আধুনিক ক্যামেরা, উন্নত নিরাপত্তা এবং প্রিমিয়াম ডিজাইনের কারণে স্মার্টফোনপ্রেমীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে অ্যাপলের এই ডিভাইস। তবে এই আকাশচুম্বী চাহিদাকে কেন্দ্র করে দেশের বাজারে গড়ে উঠেছে এক বিশাল সমান্তরাল বাজার। একদিকে যেমন অফিশিয়াল চ্যানেলে আসছে সরকার অনুমোদিত ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধিত ডিভাইস; অন্যদিকে ‘গ্রে মার্কেট’ বা লাগেজ পার্টির মাধ্যমে অননুমোদিত উপায়ে বাজারে প্রবেশ করছে নানা রঙের আইফোন।
অফিশিয়াল আইফোন: কার মাধ্যমে বিস্তৃত হচ্ছে নেটওয়ার্ক?
বাংলাদেশে অ্যাপলের অফিশিয়াল ডিভাইস আমদানি ও বিপণনের পুরো প্রক্রিয়াটি এখন বেশ সুসংগঠিত। অ্যাপলের বিশ্বস্ত নিয়মাবলী মেনে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গে কাজ করছে:
জেনারেশন নেক্সট কমিউনিকেশনস (জি-নেক্সট): বাংলাদেশে অ্যাপলের প্রধান অফিশিয়াল ন্যাশনাল ডিসট্রিবিউটর বা আমদানিকারক হিসেবে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। পাইকারি পর্যায়ে বাজারজাতকরণ ও চ্যানেল পার্টনারদের কাছে অফিশিয়াল আইফোন পৌঁছে দিতে তারা মূল ভূমিকা রাখছে।
সেলেক্সট্রা লিমিটেড: অ্যাপলের অন্যতম প্রধান অফিশিয়াল ইমপোর্টার ও রিটেইলার হিসেবে দেশের বড় শপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তারা নিয়মিত অফিশিয়াল আইফোন সরবরাহ করছে।
এক্সিকিউটিভ মেশিনস লিমিটেড: ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশে অ্যাপলের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অনুমোদিত রিসেলার এবং অনুমোদিত সার্ভিস প্রোভাইডার (এএএসপি)। অফিশিয়াল ডিভাইস বিক্রির পাশাপাশি তারা জেনুইন সার্ভিসিংয়ের নির্ভরযোগ্য নাম।
গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার (জিঅ্যান্ডজি): দেশজুড়ে বিস্তৃত প্রিমিয়াম রিটেইল চেইনের মাধ্যমে অ্যাপলের অন্যতম প্রধান রিটেইল পার্টনার হিসেবে এরা আইফোন বিক্রি করছে। সহজ কিস্তি (ইএমআই) সুবিধার জন্য এটি বেশ জনপ্রিয়।
আইসেন্টার লিমিটেড: যমুনা ফিউচার পার্ক এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটিও অ্যাপলের অনুমোদিত বিক্রেতা ও সার্ভিস পার্টনার হিসেবে সুনামের সঙ্গে সেবা দিচ্ছে।
অননুমোদিত ও ‘লাগেজ’ মার্কেটের মূল ঝুঁকি
সামান্য কম দামে আইফোন কেনার লোভে অনেকেই গ্রে মার্কেট বা লাগেজ পার্টির শরণাপন্ন হন। কোনো শুল্ক বা ভ্যাট না দিয়ে চোরাপথে কিংবা ব্যক্তিগত ব্যাগেজে করে দেশে নিয়ে আসা এসব সেটে বেশ কিছু বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে যায়:
১. নেটওয়ার্ক ব্লকের শঙ্কা: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থার কারণে অননুমোদিত আইএমইআই (IMEI) নম্বরযুক্ত ফোন যেকোনো সময় জাতীয় মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন বা ব্লক হয়ে যেতে পারে।
২. ওয়ারেন্টি জটিলতা: লাগেজ বা গ্রে মার্কেটের ফোনে অ্যাপলের অফিশিয়াল আন্তর্জাতিক ওয়ারেন্টি পেতে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় বিক্রেতারা নিজস্ব লোকাল ওয়ারেন্টি দিলেও তা অ্যাপলের অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টার থেকে গ্রহণ করা হয় না।
৩. পুনর্নবীকৃত বা পুরোনো পণ্যের ঝুঁকি: অনেক অসাধু ব্যবসায়ী পুরোনো, ব্যবহৃত কিংবা মেজেঘষে প্রস্তুত করা (রিফার্বিশড) ফোন নতুন বলে গ্রে মার্কেটে বিক্রি করে দেয়, যা ক্রেতার জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়।
৪. আইনি জটিলতা ও রাজস্ব ফাঁকি: যথাযথ শুল্ক না দিয়ে আমদানিসংক্রান্ত অপরাধ এবং ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার মতো আইনি ঝামেলা এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।
কেন অনুমোদিত পার্টনারদের ওপর ভরসা রাখা শ্রেয়?
জি-নেক্সট, সেলেক্সট্রা, এক্সিকিউটিভ মেশিনস, গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার কিংবা আইসেন্টারের মতো অনুমোদিত চ্যানেল থেকে আইফোন কেনা মানে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক শান্তি নিশ্চিত করা।
অফিশিয়াল চ্যানেলে কেনা প্রতিটি নতুন আইফোনে থাকে ১ বছরের অফিশিয়াল আন্তর্জাতিক ওয়ারেন্টি, যা দেশের অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে বিনামূল্যে সেবা নিশ্চিত করে। বিটিআরসি অনুমোদিত আইএমইআই নিবন্ধিত থাকায় এতে নেটওয়ার্ক বন্ধ হওয়ার কোনো ভয় থাকে না। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে শূন্য শতাংশ সুদে কিস্তি (নো-কস্ট ইএমআই) সুবিধা, জেনুইন অ্যাক্সেসরিজ এবং অফিশিয়াল ভ্যাট চালান কেবল অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই পাওয়া সম্ভব।
বিকল্প উৎস থেকে কেনার ক্ষেত্রে জরুরি সতর্কতা
বাজেট বা বিশেষ অফারের কারণে কেউ অনুমোদিত শোরুমের বাইরে থার্ড-পার্টি দোকান থেকে আইফোন কিনতে চাইলে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন:
আইএমইআই ও বিটিআরসি স্ট্যাটাস: ডিভাইসটি কেনার আগেই বক্স এবং ফোনের সেটিংস থেকে আইএমইআই নম্বর মিলিয়ে নিতে হবে এবং তা বিটিআরসির ডেটাবেজে নিবন্ধিত কি না যাচাই করা উচিত।
ওয়ারেন্টি স্ট্যাটাস: অ্যাপলের নিজস্ব অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে ফোনের সিরিয়াল নম্বর ইনপুট দিয়ে নিশ্চিত হতে হবে ওয়ারেন্টি অ্যাক্টিভ রয়েছে কি না বা ফোনটি আগে ব্যবহৃত হয়েছে কি না।
প্যাকেজিং ও ভ্যাট চালান: ফোনের বক্সের প্লাস্টিক র্যাপ এবং সিল সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে কি না দেখে নিতে হবে। তা ছাড়া কেনাকাটার সময় দোকান থেকে অবশ্যই অফিশিয়াল ক্যাশ মেমো ও ভ্যাটযুক্ত পাকা রসিদ সংগ্রহ করতে হবে।
পরিশেষে, আইফোন কেবল একটি প্রযুক্তিপণ্য নয়, এটি একটি বড় অঙ্কের আর্থিক বিনিয়োগ। সাময়িক কিছু টাকা বাঁচানোর লোভে ঝুঁকিপূর্ণ গ্রে মার্কেটের পথ বেছে না নিয়ে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে অফিশিয়াল আইফোন কেনাই সচেতন ক্রেতার সঠিক সিদ্ধান্ত।


