বুধবার, জুন ২৪, ২০২৬
34.6 C
Dhaka

সেমিকন্ডাক্টর খাত: ডিজাইন ও প্যাকেজিংয়ে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালু চেইনে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে একটি সুচিন্তিত কৌশল গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশনের প্রতিযোগিতায় এখনই না নেমে, দেশীয় মেধার ওপর ভিত্তি করে উচ্চ-মূল্যের চিপ ডিজাইন, টেস্টিং এবং প্যাকেজিং খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সুবিধা ও লক্ষ্যমাত্রা

এই উদীয়মান শিল্পকে এগিয়ে নিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের জন্য এক দশকের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে সরকার। নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত কাস্টমস ডিউটি (আমদানি শুল্ক) ও ভ্যাটে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। এই সুবিধাগুলো মূলত ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (ইডিএ) টুলস, প্রোপ্রাইটরি সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সফটওয়্যার, উন্নত প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি এবং বিশেষায়িত টেস্টিং সরঞ্জামের আমদানির ওপর প্রযোজ্য হবে, যা স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা প্রসারের নিশ্চয়তা দিচ্ছে।

বর্তমানে এই খাত থেকে বার্ষিক রপ্তানি আয় মাত্র ৮ মিলিয়ন ডলার। সরকারের লক্ষ্য ২০৩১ সাল পর্যন্ত চলমান এই আর্থিক ও নীতিগত সুবিধার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে এই আয়কে ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (আইসি) ডিজাইন, আউটসোর্সড সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি অ্যান্ড টেস্টিং (ওস্যাট) এবং অত্যাধুনিক গবেষণা ও উন্নয়নে দেশি-বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ করাই এর প্রধান লক্ষ্য।

বর্তমান সক্ষমতা ও অগ্রগতি

সেমিকন্ডাক্টর খাতের টাস্কফোর্সের রোডম্যাপ অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, মধ্যমেয়াদে টেস্টিং ও প্যাকেজিং এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশনকে সাজানো হয়েছে। এই কৌশল ইতিমধ্যেই বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। উলকাসেমি, নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর, প্রাইম সিলিকন টেকনোলজি এবং সিলিকনোভার মতো স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও ইঞ্জিনিয়ারিং সেবা দিচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা ১৮০ ন্যানোমিটার থেকে শুরু করে একেবারে অত্যাধুনিক ২ ন্যানোমিটার টেকনোলজি নোডের চিপ ডিজাইন প্রকল্পে সফলভাবে কাজ করছেন। তারা রেজিস্টার ট্রান্সফার লেভেল (আরটিএল) ডিজাইন, ডিজাইন ভেরিফিকেশন, ফিজিক্যাল ডিজাইন, অ্যানালগ অ্যান্ড মিক্সড-সিগন্যাল লেআউট, আরএফ ডিজাইন, ফার্মওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও চিপ প্যাকেজিংয়ের মতো জটিল সেবা প্রদান করছেন।

এই খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দেশের প্রকৌশল মেধা। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) গ্র্যাজুয়েট এবং প্রায় ২৬ হাজার কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে, যা চিপ ডিজাইনের জন্য একটি বড় মানবসম্পদ বা ডোল তৈরি করছে।

বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শুধু শুল্ক ছাড় বা প্রণোদনাকেন্দ্রিক সুবিধা এই খাতের জন্য যথেষ্ট নয়। একাডেমিক শিক্ষা ও শিল্পের চাহিদার মধ্যে কিছু ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হলেও, তাদের চিপ ডিজাইনের উপযোগী করতে প্রায় এক বছরের বিশেষায়িত ভেরি লার্জ স্কেল ইন্টিগ্রেশন (ভিএলএসআই) প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। এছাড়া জটিল প্রকল্পে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরও সংকট রয়েছে।

এই খাতের পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হলে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

    সেন্টার অব এক্সিলেন্স তৈরি এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়।

    শিল্প-মানসম্পন্ন ইডিএ টুলগুলোর সহজলভ্যতা এবং টেকসই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।

    উন্নত টেস্টিং ল্যাব, প্যাকেজিং অবকাঠামো ও গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন।

    শক্তিশালী মেধাস্বত্ব (আইপি) সুরক্ষা আইন প্রণয়ন।

    নগদ প্রণোদনা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং হাই-টেক পার্কগুলোতে ভাড়া-মুক্ত জমি বরাদ্দ দেওয়া।

বৈশ্বিক বাজার ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনারের তথ্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বৈদ্যুতিক যানবাহন, ফাইভজি এবং অটোমেশনের চাহিদার ওপর ভর করে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার ২০২৬ সালের মধ্যে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।

এই বিশাল বাজারে আঞ্চলিক প্রতিযোগী ভারত ও ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ভারত তাদের সেমিকন্ডাক্টর মিশনের আওতায় ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট ও চিপ ডিজাইনের জন্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য নিয়ে ১০০টি ডিজাইন ফার্ম ও ৫০ হাজার প্রকৌশলী তৈরির পরিকল্পনা করেছে।

তবে সঠিক নীতিমালার সুবাদে ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ভেরিফিকেশন ও টেস্টিং সাপোর্টের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক হাব হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। চলতি দশকের শেষ নাগাদ দেশে অন্তত ৫০টি ভিএলএসআই ডিজাইন কোম্পানি, তিনটি সেমিকন্ডাক্টর টেস্টিং কেন্দ্র, দুটি প্যাকেজিং শিল্প এবং দেশের প্রথম গ্লোবাল সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সেন্টার স্থাপিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই সপ্তাহের জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে ‘বিপিও সামিট ২০২৬‘ উদ্বোধন করেন প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ কন্ট্যাক্ট সেন্টার এন্ড আউটসোর্সিং...

বাংলাদেশে চালু থাকছে দারাজ

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: বাংলাদেশে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে...

সিলিকন ভ্যালিতে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর বিপ্লব

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রাণকেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে...

বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে দেশের প্রথম হুয়াওয়ে ডিসপ্লে জোন উদ্বোধন

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: হুয়াওয়ে বাংলাদেশ দেশের প্রথম হুয়াওয়ে ডিসপ্লে জোন...

নতুন স্মার্টফোন হেলিও ৪৬ উন্মোচন

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: স্মার্টফোন ব্র্যান্ড হেলিও আজকে উদ্বোধন করলো নতুন...

সর্বশেষ

অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ে সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: দেশের যুবসমাজকে রক্ষা করতে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা...

বাইপাস চার্জিং যেভাবে স্মার্টফোনকে আরও নিরাপদ করে তুলছে

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: স্মার্টফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া বা ব্যাটারির...

শুরু হতে যাচ্ছে ফিনিক্স সামিট ২০২৬

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা ইকোসিস্টেমকে জোরদার করতে টেকনিক্যাল ওয়ার্কশপ...

আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে ডিস্ট্রিবিউটরদের সাথে বিকাশের ধারাবাহিক মতবিনিময় সভা

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: অনলাইন জুয়া, হুন্ডি এবং মানি লন্ডারিংয়ের মতো...

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে সিএসই রিসার্চ ডে অনুষ্ঠিত

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে ‘সিএসই রিসার্চ ডে ২০২৬’ অনুষ্ঠিত...

নতুন স্মার্টফোন হেলিও ৪৬ উন্মোচন

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: স্মার্টফোন ব্র্যান্ড হেলিও আজকে উদ্বোধন করলো নতুন...

একই সম্পর্কিত পোস্ট

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি