টেকভিশন২৪ ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ব্যবহৃত চিপের ব্যাপক চাহিদার ফলে বিশ্বের বৃহত্তম মেমোরি নির্মাতা স্যামসাং ইলেকট্রনিকস কোংয়ের শেয়ারের দাম গত এক বছরে চার গুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। ফলে সংস্থাটি ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার মূল্যায়নে পৌঁছেছে।
বুধবার সকালে দক্ষিণ কোরীয় সংস্থাটির শেয়ারের দাম ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় এই মাইলফলকটি অর্জিত হয়। ফলে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোংয়ের পর এটি দ্বিতীয় এশীয় সংস্থা হিসেবে এই মাইলফলক ছুঁয়েছে।
এই লাভের ফলে কোসপি বেঞ্চমার্ক প্রথমবারের মতো সাত হাজার স্তরের ওপরে উঠে যায়।
স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স এবং টিএসএমসি—এই বড় চিপ নির্মাতা কম্পানিগুলো এমন এক পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে, যার ফলে এশিয়া এখন বিশ্বজুড়ে এআই খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠছে। এখানে চিপ তৈরির শক্তির সঙ্গে দ্রুত বাড়ছে ডাটা অবকাঠামোও। এই পরিবর্তনের কারণে এশিয়ার প্রযুক্তি কম্পানিগুলোর শেয়ারের দামও দ্রুত বেড়েছে।
এসকে হাইনিক্স এবং টিএসএমসি এই মাসেই রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। কারণ বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, উন্নত চিপ এবং বেশি কম্পিউটিং শক্তির চাহিদা সামনে আরো বাড়বে।
নিউ ইয়র্কের রাউন্ডহিল ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী ডেভ ম্যাজা বলেছেন, ‘এই ট্রিলিয়ন ডলার সীমা শুধু প্রতীকী নয়, এর বাস্তব গুরুত্বও আছে। সহজভাবে বললে, বাজার এখন মনে করছে, এআই অবকাঠামোতে মেমরির ভূমিকা সাময়িক নয়, বরং স্থায়ী ও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কয়েক দিন আগেই স্যামসাংয়ের সেমিকন্ডাক্টর বিভাগ মার্চ প্রান্তিকে বড় ধরনের মুনাফা করেছে, যা আগের তুলনায় প্রায় ৪৮ গুণ বেশি। এর মূল কারণ হলো এআই ডাটা সেন্টারের বিপুল অর্ডার। বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ সীমিত থাকায় চিপের দাম বাড়ছে আর এই প্রবণতা আগামী কয়েক প্রান্তিকেও স্যামসাংয়ের রেকর্ড মুনাফা আরো বাড়াতে পারে।
এদিকে অ্যাপল তাদের ডিভাইসের প্রধান প্রসেসর যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি করার জন্য স্যামসাংয়ের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেছে। এতে দীর্ঘদিনের অংশীদার টিএসএমসি ছাড়াও অ্যাপলের জন্য আরেকটি বিকল্প তৈরি হতে পারে।
জুপিটার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক স্যাম কনরাড বলেন, স্যামসাং ইলেকট্রনিকস নিয়ে খোঁজ নিলে বোঝা যায়, এখন পর্যন্ত এর পারফরম্যান্স পুরোটা কাজে লাগানো না হলেও এটি এখনো আকর্ষণীয় বিনিয়োগের সুযোগ।
তিনি আরো বলেন, মেমরি বাজারে বর্তমানে সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে। স্যামসাং জানিয়েছে, ২০২৬ সালের তুলনায় ২০২৭ সালে সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান আরো বাড়তে পারে। ফলে ন্যান্ড ও ডিআরএএম চিপের দাম আরো বাড়ার সম্ভাবনা আছে।
এদিকে সাম্প্রতিক শেয়ার দর বৃদ্ধির পেছনে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় গণমাধ্যম বলছে, ইন্টারেক্টিভ ব্রোকার্স এবং স্যামসাং সিকিউরিটিজের একটি চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা সরাসরি কোরিয়ার শেয়ার কিনতে পারছেন। বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীরা সোমবার প্রায় রেকর্ড পরিমাণ ২.৯ ট্রিলিয়ন ওন (প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের কোসপি শেয়ার কিনেছেন। ছুটির পর বুধবার থেকে আবারও শেয়ার কেনা শুরু হয়েছে।
তবে স্যামসাং কিছু চ্যালেঞ্জের মুখেও আছে। চিপ ব্যবসা ভালো করলেও মোবাইল ফোন ও ডিসপ্লে বিভাগে আয় কমছে আর কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের দামও বেড়েছে। এ ছাড়া এআই থেকে পাওয়া বাড়তি মুনাফার অংশ নিয়ে কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এ কারণে এই মাসের শেষ দিকে ১৮ দিনের সাধারণ ধর্মঘটের হুমকিও দিয়েছেন কর্মীরা।
তবুও বিশ্লেষকদের মতে, আগামী এক বছরে স্যামসাংয়ের শেয়ার প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বর্তমানে এটি তুলনামূলক কম দামে লেনদেন হচ্ছে। এটি আগের তুলনায় অনেক কম।
স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের বড় উত্থানের কারণে কোরিয়ার শেয়ারবাজারও শক্তিশালী হয়েছে। এই দুই কম্পানি মিলেই কোসপি সূচকের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বুধবার সূচকটি প্রায় ৫.৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়, আর দ্রুত উত্থানের কারণে শেয়ারবাজারে সাময়িকভাবে স্বয়ংক্রিয় ক্রয়ও বন্ধ করতে হয়।
এই কোরিয়ান জুটি এশিয়ার স্টক বেঞ্চমার্ককে সর্বকালের সর্বোচ্চ উচ্চতায় নিয়ে যেতেও ভূমিকা রেখেছে। যেহেতু কম্পানিগুলো এআই খাতে ব্যয়ের জোয়ারে ভাসছে, বিনিয়োগকারীরা যুক্তি দিচ্ছেন, মেমোরি এখন চাহিদার এক সুপার-সাইকেলে রয়েছে, যা কয়েক দশক ধরে চলে আসা উত্থান-পতনের চক্রকে ভেঙে দিচ্ছে।
জেপিমরগ্যান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের এশিয়া-প্যাসিফিক ইক্যুইটি দলের প্রধান মার্ক ডেভিডস বলেন, সামগ্রিকভাবে কম্পানিগুলোর আয় ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে, এর প্রধান চালক হলো প্রযুক্তি খাত।
তিনি আরো বলেন, স্যামসাংয়ের এই মুনাফা এমন এক অস্বাভাবিক সময়ের প্রতিফলন, যখন বড় প্রযুক্তি কম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ মুনাফা করতে সক্ষম হচ্ছে।




