টেকভিশন২৪ ডেস্ক: বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতকে শুধু একটি সহায়ক খাত হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, প্রযুক্তিনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তুলে দেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আইসিটি রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এআইকে কেন্দ্র করে নতুন ডিজিটাল অর্থনীতি
এবারের বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা। বাজেটে বলা হয়েছে, শিক্ষা ব্যবস্থায় এআই অন্তর্ভুক্ত করে তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন এবং এআইভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
সরকারি পরিকল্পনা ও সেবা প্রদানে ‘এআই ড্রিভেন ডেটা সেন্টার’ ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে বলে সরকারের প্রত্যাশা। পাশাপাশি নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বাড়াতেও এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্টার্টআপ খাতের জন্য ৫০০ কোটি টাকার তহবিল
দেশের প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য বাজেটের অন্যতম বড় ঘোষণা হলো ৫০০ কোটি টাকার ‘স্টার্টআপ তহবিল’। নতুন উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোকে সহায়তা দিতে এ তহবিল গঠন করা হবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য এই বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে স্টার্টআপ খাত অর্থায়নের সংকটে ভুগছে। ফলে এ তহবিল কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রযুক্তি খাতে নতুন কর্মসংস্থান এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগের পথ আরও প্রসারিত হতে পারে।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার বিস্তার
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মানবসম্পদ তৈরিকে বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্কুল পর্যায়ে প্রযুক্তি ও এআইভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ, “ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব” কর্মসূচি, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ স্থাপন এবং বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া শক্তিশালী ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং স্টার্টআপ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা তৈরির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রযুক্তি ব্যবসার করসুবিধা অব্যাহত
ডিজিটাল অর্থনীতিকে উৎসাহ দিতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিদ্যমান কর অব্যাহতির সুবিধা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করে আয় করছেন এবং এটি এখন জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
একই সঙ্গে মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পের ভ্যাট অব্যাহতি ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদনেও ভ্যাট সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখার ঘোষণা এসেছে।
ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা
সরকার রাজস্ব ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বা ‘এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশন’-এর আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। কর ফাঁকি কমানো, করদাতাদের হয়রানি হ্রাস এবং ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হবে।
এটি বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা পরিচালনার খরচ ও সময় কমার পাশাপাশি ডিজিটাল গভর্ন্যান্স আরও শক্তিশালী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামনে কী?
সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড় করিয়েছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এবং প্রযুক্তিভিত্তিক মানবসম্পদ উন্নয়ন। পাশাপাশি স্থানীয় প্রযুক্তি উৎপাদন, ডিজিটাল কর ব্যবস্থা এবং আইসিটি রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
যদি ঘোষিত কর্মসূচিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এ বাজেট বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।


