টেকভিশন২৪ ডেস্ক: আমেরিকান টেক জায়ান্ট বা প্রযুক্তি একচেটিয়াদের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আরও একধাপ এগিয়ে গেল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এবার ইউরোপীয় পার্লামেন্ট তাদের অভ্যন্তরীণ সব দাপ্তরিক কম্পিউটারে ডিফল্ট বা প্রাথমিক সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে গুগলের ব্যবহার বন্ধ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রভাবশালী বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর বরাত দিয়ে জানা গেছে, আগামী ৪ জুন থেকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সব কম্পিউটারের ফায়ারফক্স এবং এজ ব্রাউজারের অ্যাড্রেস বারে যেকোনো কিছু সার্চ করলে তা গুগলের বদলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফ্রান্সের তৈরি নিজস্ব সার্চ ইঞ্জিন ‘কোয়ান্ট’-এর মাধ্যমে প্রদর্শিত হবে। তবে পার্লামেন্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাইলে ম্যানুয়ালি গুগলের ওয়েবসাইটে যেতে পারবেন কিংবা তাদের ব্রাউজারের ডিফল্ট সেটিং পরিবর্তন করে নিতে পারবেন।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কর্মীদের কাছে পাঠানো একটি অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইলের সূত্র ধরে জানা গেছে, পার্লামেন্টের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য বা ডেটা সুরক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই বড় পরিবর্তনটি আনা হচ্ছে। ওই ইমেইলে ফ্রান্সের তৈরি ‘কোয়ান্ট’ সার্চ ইঞ্জিনটিকে একটি সম্পূর্ণ ‘ইউরোপীয় ও ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা-বান্ধব’ সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা গুগলের মতো ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত ডেটা ট্র্যাক বা বিক্রি করে না।
মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি প্রযুক্তির ওপর থেকে ইউরোপের একক নির্ভরতা কমিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিগত বিকল্প বা ‘মেড ইন ইউরোপ’ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউরোপীয় কমিশন ৩ জুন একটি বিশেষ ‘সার্বভৌমত্ব প্যাকেজ’ উন্মোচন করতে যাচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স এই লক্ষ্যে সবচেয়ে আগ্রাসী ভূমিকা পালন করছে। ফরাসি সরকার ইতিমধ্যেই তাদের সব সরকারি দপ্তরের কম্পিউটার থেকে মাইক্রোসফটের ‘উইন্ডোজ’ অপারেটিং সিস্টেম সরিয়ে সম্পূর্ণ ওপেন সোর্স ‘লিনাক্স’ ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে। এর পাশাপাশি ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের জন্য মার্কিন অ্যাপ জুম বা মাইক্রোসফট টিম-এর ব্যবহার স্থায়ীভাবে বর্জন করে ফ্রান্সের নিজস্ব অ্যাপ ‘ভিজিও’ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গুগল সার্চ ইঞ্জিন বর্জনের এই তালিকায় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট অবশ্য একা নয়। বিশেষ করে গুগল সম্প্রতি তাদের সাধারণ সার্চ রেজাল্টের ভেতর যেভাবে জোর করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা জেনারেটিভ এআই ফিচার যুক্ত করছে, তাতে বিশ্বজুড়ে সাধারণ ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ গুগলের ওপর ক্ষুব্ধ। আর এই সুযোগে গুগলের প্রধান প্রতিযোগী এবং গোপনীয়তা-বান্ধব সার্চ ইঞ্জিন ‘ডাকডাকগো’-এর ব্যবহার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
ডাকডাকগো-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গুগলের এআই পরিবর্তনের ঘোষণার পর থেকে তাদের অ্যাপ ইনস্টল করার হার অবিশ্বাস্য রকমের বৃদ্ধি পেয়েছে। ডাকডাকগো ব্যবহারকারীদের জন্য সার্চ রেজাল্ট থেকে জেনারেটিভ এআই সম্পূর্ণ বন্ধ বা অফ করে রাখার সুবিধা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, গত ১ জুন তারা তাদের ইতিহাসের এক দিনে সর্বোচ্চ সার্চ ট্রাফিকের সর্বকালীন রেকর্ড ভেঙেছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের গুগল বর্জনের এই ঘটনাটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে সিলিকন ভ্যালির একচেটিয়া আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক বিরাট ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গুগলের এআই নির্ভরতা এবং ইউরোপের নিজস্ব প্রযুক্তি স্বাবলম্বী হওয়ার এই লড়াই আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের চেনা সমীকরণ অনেকটাই বদলে দেবে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা।


