মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
30.8 C
Dhaka

এআইয়ের নতুন যুগে বাংলাদেশ: এআই ডেটা সেন্টার গড়ার চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: বিশ্ব অর্থনীতির পরতে পরতে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের স্পষ্ট প্রভাব। প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া এই ডিজিটাল বাস্তবতায় এআই প্রযুক্তির মূল ভিত্তিমূল হিসেবে কাজ করছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডেটা সেন্টার। যেখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সুবিশাল সব এআই মডেলকে, প্রসেস করা হয় কোটি কোটি তথ্য। তবে এই অবকাঠামো গড়ে তোলার মূল্য মোটেও কম নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের প্রায় দেড় শতাংশই গ্রাস করছে এই এআই ডেটা সেন্টারগুলো। বিদ্যুৎ তো আছেই, সেই সঙ্গে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ সুপেয় পানি ও উচ্চগতির ব্যান্ডউইডথ। বিশ্বব্যাপী এমন এক জটিল ও বিপুল সম্পদনির্ভর অবকাঠামোর প্রেক্ষাপটে উঠছে একটি বড় প্রশ্ন- এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের এই মহাযজ্ঞে বাংলাদেশ ঠিক কতটা প্রস্তুত?

সম্প্রতি এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা উসকে দিয়েছে ‘এআইডিসিকিউ’ (AIDCQ) নামের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবনা। তারা বাংলাদেশে প্রায় ২০০ কোটি ডলার বা ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে একটি ‘ফ্রন্টিয়ার এআই ডেটা সেন্টার ও কোয়ান্টাম-রেডি সভরেন কম্পিউট ক্যাম্পাস’ নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক ধাপে দুই বছরের মধ্যে ৩০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ডেটা সেন্টার স্থাপন করা হবে, যা পরবর্তী সময়ে ১০০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সম্প্রসারিত হতে পারে। পুরো প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে অর্থায়নের কথাও বলা হয়েছে। প্রস্তাবনাটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে কি না, তা ভবিষ্যৎই বলবে; তবে এটি নিশ্চিতভাবে উন্মোচন করেছে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত প্রস্তুতির অসংগতি ও সম্ভাবনার নানান দিক।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো একেবারে শূন্য নয়, তা সত্যি। ‘বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড’-এর আওতায় গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ফোর-টায়ার জাতীয় ডেটা সেন্টার আগেই গড়ে উঠেছে। এমনকি সেটিতে সম্প্রতি সীমিত পরিসরে শেয়ারড জিপিইউ ক্লাউড সেবাও চালু করা হয়েছে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে একটি সাধারণ ডেটা সেন্টার পরিচালনা করা আর ৫০ বা ১০০ মেগাওয়াটের ফ্রন্টিয়ার লেভেলের এআই মেগা-ক্যাম্পাস সামলানো এক জিনিস নয়। বিশাল এই ব্যবধান দূর করতে প্রয়োজন একটি পরিপূর্ণ ও শক্তিশালী টেকসই ইকোসিস্টেম, যা কেবল জিপিইউ সার্ভারের ওপর নির্ভর করে না, বরং দেশের মূল বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক, পরিবেশ ও আইসিটি পলিসির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

প্রথম ও সবচেয়ে প্রধান বাধাটি বিদ্যুতের। এআই ডেটা সেন্টারের জন্য ৩০ বা ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশের বিদ্যমান বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বিচারে খুব বড় সংখ্যা নাও মনে হতে পারে। কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ উৎপাদনের অঙ্কে নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থায়িত্বে। এআই ডেটা সেন্টারের মূল শর্ত হলো বছরজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ। মাত্র কয়েক মিলি-সেকেন্ডের বিদ্যুৎ বিভ্রাট কিংবা ভোল্টেজ ওঠানামা বিশাল অংকের আর্থিক ও কৌশলগত ক্ষতির কারণ হতে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির অধ্যাপক ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার এ প্রসঙ্গে মনে করেন, নিজস্ব এআই ডেটা সেন্টার গড়ে তুলতে পারলে দেশের তথ্য জাতীয় সীমানার ভেতরে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে এবং ব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল বৈদেশীক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো, বিদ্যমান জাতীয় গ্রিড দিয়ে এই ১০০ শতাংশ নিরবচ্ছিন্নতার নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন। যদিও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের জন্য ১০০ মেগাওয়াটের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের প্রস্তাব রেখেছে, তবে সেটির জ্বালানি উৎস এবং গ্রিড ইন্টারকানেকশন নিশ্চিত করা বিশাল এক প্রশাসনিক পরীক্ষা।

বিদ্যুতের পর দ্বিতীয় বড় প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত ধকল আসে শীতলীকরণ বা কুলিং প্রক্রিয়া ঘিরে। হাজার হাজার হাই-পারফর্ম্যান্স জিপিইউ যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখন যে পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হয়, তা অপসারণ করতে লিকুইড কুলিং বা ওয়াটার-বেসড কুলিং অপরিহার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের আর্দ্র ও ক্রান্তীয় আবহাওয়ায় এই তাপ ব্যবস্থাপনা সাধারণ দেশের তুলনায় আরও জটিল। প্রথাগত কুলিং টাওয়ারে যে পরিমাণ সুপেয় ভূগর্ভস্থ পানি ব্যয় হয়, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবিরের মতে, এ ধরনের প্রকল্প অনুমোদনের আগে পানির স্তর, বর্জ্য অপসারণ ও পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব কঠোরভাবে পরিমাপ করা উচিত। প্রস্তাবিত প্রকল্পে অবশ্য ‘ডিরেক্ট লিকুইড’ ও ‘ক্লোজড-লুপ’ ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে, যা পানির অপচয় কমায়। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির বিকল্প ব্যবস্থাপনা কতখানি কার্যকর হবে?

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো ডাটা হাইওয়ে বা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক কানেক্টিভিটি। এআই ডেটা সেন্টার চালনায় বিপুল নেটওয়ার্ক ব্যান্ডউইডথ ও অতি-নিম্ন লেটেন্সি (Latency) বাধ্যতামূলক। বর্তমানে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসির সাগরের তলদেশের সি-মি-উই-৪ এবং সি-মি-উই-৫ ক্যাবলের মাধ্যমে ব্যান্ডউইডথ ক্যাপাসিটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়লেও, কেবল ফাইবার অপটিক্সের স্পিড থাকাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একাধিক রুটভিত্তিক বিকল্প আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে এবং ফেইল-সেফ ব্যাকআপ ব্যবস্থা। একটি ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হলে যেন কয়েক মিলি-সেকেন্ডের মধ্যেও যোগাযোগে কোনো ছেদ না পড়ে, সেই লেভেলের রিডান্ডেন্সি তৈরি না করে এত বড় ডেটা হাব গড়ে তোলা প্রযুক্তিগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

অবকাঠামো প্রস্তুত হলেও দিনশেষে প্রয়োজন পড়ে তা চালনার মতো দক্ষ প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের। বাংলাদেশে চমৎকার সব সফটওয়্যার ডেভলপার ও কোডার থাকলেও হাইপারস্কেল মেগা কম্পিউটিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার সামলানোর মতো ডেটা সেন্টার মেকানিক্যাল প্রকৌশলী, সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট কিংবা ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার আর্কিটেক্টের চরম ঘাটতি রয়েছে। যদিও বিনিয়োগের প্রস্তাবে বিশাল কর্মসংস্থানের আশার বাণী শোনানো হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ কি সেই স্তরের বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে পারছে? আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি বিদেশি বিশেষজ্ঞ এনে প্রাথমিক কাজ চালানো গেলেও স্থানীয় দক্ষ জনবল তৈরি ছাড়া এমন একটি প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব।

সবশেষে আসে বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা ও বাজারজাতকরণের প্রশ্ন। ১০০ বা ২০০ মেগাওয়াটের বিপুল সক্ষমতার আঞ্চলিক কম্পিউট হাবে পরিণত হতে হলে কেবল দেশীয় সরকারি বা বেসরকারি ব্যাংকের চাহিদা দিয়ে তা পোষানো যাবে না। অবশ্যই আন্তর্জাতিক টেক জায়ান্ট ও আঞ্চলিক গ্রাহকদের কাছে এই প্রসেসিং পাওয়ার বিক্রি করতে হবে। আর আন্তর্জাতিক টেক ক্লায়েন্ট পেতে হলে বিশ্বমানের সাইবার নিরাপত্তা, কম লেটেন্সি ও অত্যন্ত কড়া ও স্পষ্ট ডেটা প্রাইভেসি এবং সুরক্ষা আইন থাকতে হয়। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে মেগা এআই ডেটা সেন্টার কেবল মেগা বিনিয়োগের গল্প নয়; এটি দেশের বিদ্যুৎ, পরিবেশ, নেটওয়ার্ক ও মানবসম্পদের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। নীতিগত স্বচ্ছতা ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি না করে এ জাতীয় উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে এগোনো হলে, তা অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে উল্টো বড় ধরনের বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

এই সপ্তাহের জনপ্রিয়

চড়া দামে নাভিশ্বাস: পুরোনো র‍্যাম-এসএসডিতে ঝুঁকছেন ক্রেতারা

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বিশ্বব্যাপী অভূতপূর্ব...

আলো দিয়ে মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ: চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: আলোর সাহায্যে মস্তিষ্কের একক স্নায়ুকোষ বা নিউরন...

বাংলাদেশের প্রথম ট্রেডট্রাস্ট-রেডি পার্টনার হলো স্পেকট্রাম

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রথম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি...

চট্টগ্রামের ইন্টারনেট সেবা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ, সতর্ক করল বিটিআরসি

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: গতকাল ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ চট্টগ্রামের মেরিডিয়ান...

জাকার্তায় তিনদিনের ‘অ্যাসোসিও ডিজিটাল অ্যান্ড এআই সামিটে বিসিএস

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বাণিজ্যিক...

সর্বশেষ

বাংলাদেশ ফিনটেক অ্যাওয়ার্ডসে জোড়া স্বীকৃতি পেল ‘গোল্ড কিনেন’

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: প্রযুক্তির সহায়তায় স্বর্ণ সঞ্চয়কে সর্বজনীন ও সহজলভ্য...

দেশে ক্যাননের ৪ মডেলের পেশাদার ক্যামেরা উন্মোচন করল স্মার্ট টেকনোলজিস

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: বাংলাদেশের সম্প্রচার, চলচ্চিত্র নির্মাণ ও পেশাদার ভিডিও...

রংপুরে নতুন গ্রামীণফোন সেন্টার চালু

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: গ্রাহকদের জন্য নতুন প্রোডাক্ট ও ডিজিটাল-ফার্স্ট সেবা...

দেশে আইফোন ১৮ সিরিজ উন্মোচন করলো গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: দেশের একমাত্র অ্যাপল মনো স্টোর পার্টনার ও...

দেশের প্রথম আলফা স্টোর চালু করল অনার

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে নিজেদের বহুল প্রতীক্ষিত...

‘পূজার ফেস্ট, শাওমি’তে বেস্ট’ ক্যাম্পেইনে কার্ডবিহীন কিস্তি সুবিধা

টেকভিশন২৪ ডেস্ক: গ্লোবাল টেকনোলজি ব্র্যান্ড ও বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান...

একই সম্পর্কিত পোস্ট

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি