টেকভিশন২৪ ডেস্ক: দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, প্রশাসকনির্ভরতা ও একাধিক দফা জটিলতার পর অবশেষে নির্বাচনের পথে এগোচ্ছে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস—বেসিস। ২০২৬–২০২৮ মেয়াদের কার্যনির্বাহী পর্ষদ নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে ১১টি পদের বিপরীতে ২৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে সভাপতি পদেই লড়ছেন চারজন। প্রার্থীদের বড় অংশের বক্তব্যে উঠে এসেছে একটি অভিন্ন প্রত্যাশা—সদস্যদের আস্থা ফিরিয়ে এনে বেসিসকে আবারও দেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শক্তিশালী, কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তফসিল অনুযায়ী, প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশের পর আপত্তি ও আপিল নিষ্পত্তি শেষে ২ সেপ্টেম্বর বৈধ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ৩ সেপ্টেম্বর এবং ৫ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের কথা রয়েছে। নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তানিয়া ইসলাম। বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন প্রভাংশু শোম মহান ও মোহাম্মদ জাকির হোসেন।
কেন এত দীর্ঘ অপেক্ষা
বেসিসের বর্তমান নির্বাচনকে ঘিরে আগ্রহের অন্যতম কারণ সংগঠনটির সাম্প্রতিক অস্থিরতা। ২০২৪ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে ৩৩ জন প্রার্থী ১১টি পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ওই নির্বাচনে রাসেল টি আহমেদ সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১ হাজার ৪৬৪ ভোটারের মধ্যে ১ হাজার ১৫৭ জন ভোট দেন।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেসিসেও নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। সভাপতি রাসেল টি আহমেদ ২০২৪ সালের অক্টোবরে পদত্যাগ করেন। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বেসিসে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর মুহম্মদ মেহেদী হাসানকে প্রশাসক করা হয় এবং ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়নি। পরে তিনি পদত্যাগ করেন।
এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খানকে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর দায়িত্বের মধ্যেও ছিল ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত নেতৃত্বের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর।
প্রথম দফায় ২৭ জুন নির্বাচন আয়োজনের তফসিল ঘোষণা করা হলেও ভোট শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। ভোটার তালিকা, আইনি প্রক্রিয়া ও অন্যান্য জটিলতার পর নতুন করে তফসিল ঘোষণা করা হয়। নতুন সূচি অনুযায়ী ভোট হবে ২৬ সেপ্টেম্বর। নির্বাচন বোর্ড জানিয়েছে, এবার কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে মনোনয়নপত্র বাংলাদেশ সচিবালয়ে গ্রহণ করা হয়েছে।
সভাপতি পদে চারজন
বেসিসের এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় সভাপতি পদ। এ পদে প্রাথমিকভাবে প্রার্থী হয়েছেন ডিএনএস সফটওয়্যারের রাফায়েল কবীর, ডিভাইন আইটির ইকবাল আহমেদ ফখরুল হাসান, ফ্লোরা টেলিকমের মোস্তফা রফিকুল ইসলাম এবং ডিসেন্ট অ্যাক্ট ইন্টারন্যাশনালের এ কে এম আশরাফ উদ্দিন।
রাফায়েল কবীরের বক্তব্যে বেসিসকে বর্তমান সংকট থেকে বের করে আনার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তিনি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চান এবং সদস্যদের সরাসরি অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, বেসিস এখন সংকটজনক অবস্থায় রয়েছে এবং সংগঠনটিকে সেখান থেকে তুলে আনতে হবে।
অন্যদিকে মোস্তফা রফিকুল ইসলাম বলেছেন, বেসিসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান তিনি। তাঁর মতে, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই হবে সংগঠনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রথম ধাপ। সভাপতি নির্বাচিত হলে বেসিসের জন্য একটি স্থায়ী নিজস্ব ভবন নির্মাণকে তিনি অগ্রাধিকার দিতে চান। তাঁর পরিকল্পনায় ভবনটি শুধু প্রশাসনিক কার্যালয় নয়, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের প্রতীক হিসেবেও গড়ে তোলার কথা রয়েছে।
ইকবাল আহমেদ ফখরুল হাসানও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও সদস্যদের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ বেসিস গঠনের ভিত্তি হতে পারে। নির্বাচিত হলে সদস্যসেবার মান উন্নয়ন, সফটওয়্যার রপ্তানি বাড়ানো, দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পের বিকাশ, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনে সহায়তা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং সরকারের সঙ্গে কার্যকর নীতিগত সমন্বয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
১১ পদে ২৬ প্রার্থী
সভাপতি ছাড়াও সিনিয়র সহসভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাইফুল ইসলাম সিদ্দিক, নূর মাহমুদ খান ও আনিসুল হক ভূঁইয়া। সহসভাপতি—অ্যাডমিন পদে রয়েছেন রিয়াদ হাসনাইন ও মুসনাদ ই আহমদ। সহসভাপতি- ফাইন্যান্স পদে লড়ছেন তানিয়া সুলতানা, তৌফিকুল করিম সুহৃদ ও তানজিল আবেদিন।
পরিচালক—সাধারণ পদে রয়েছেন মো. জুয়েল, সুমন মোহাম্মদ তারেক, আপেল মাহমুদ খান, মো. আবদুর রাজ্জাক রূপম, দেলোয়ার আলম, আরেফিন রাফি আহমেদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, ফেরদৌস আলম, মো. রাশেদুল ইসলাম ও মো. ফুয়াদ হাসান। পরিচালক—সহযোগী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সৈয়দ শফিকুল আলম, মো. জুবায়ের ও আহমেদ আরমান সিদ্দিকী। অ্যাফিলিয়েট পরিচালক পদে একমাত্র প্রার্থী সুমায়া ইসলাম।
তবে এবারের তালিকায় একটি ব্যতিক্রমও রয়েছে। ১১টি পরিচালক পদের একটি আন্তর্জাতিক শ্রেণির জন্য নির্ধারিত হলেও সেখানে কোনো প্রার্থী নেই। বেসিসের মোট সদস্যসংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৮৮২-এর বেশি হলেও আন্তর্জাতিক শ্রেণিতে সদস্য মাত্র পাঁচজন। এ কারণে ভবিষ্যতে এই শ্রেণির জন্য আলাদা পরিচালক পদ রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সদস্যসেবা ও আন্তর্জাতিক বাজারই বড় চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘ প্রশাসকনির্ভরতার পর নির্বাচিত নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ আস্থা পুনর্গঠন। একই সঙ্গে সদস্যসেবা, সফটওয়্যার রপ্তানি, বিদেশি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং সরকারের সঙ্গে নীতিগত সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলোও সামনে থাকবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বেসিসের কার্যক্রম নিয়ে সদস্যদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কারণে সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সদস্যদের নির্বাচনে আগ্রহ কমেছে।
তবে এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের বক্তব্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট, তা হলো—বেসিসকে শুধু একটি বাণিজ্য সংগঠন হিসেবে নয়, বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের কণ্ঠস্বর হিসেবে আরও কার্যকর করে তোলার প্রত্যাশা।
সামনে মূল পরীক্ষা নির্বাচন
এবারের নির্বাচন তাই শুধু ১১টি পদে নেতৃত্ব নির্বাচনের ভোট নয়; দীর্ঘ সময়ের অস্থিরতার পর বেসিসের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, সেটিও অনেকাংশে নির্ধারণ করবে এই নির্বাচন। সদস্যদের একটি অংশ ইতোমধ্যে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক ভোটের দাবি জানিয়েছেন। নির্বাচন বোর্ডও বলছে, এবারের প্রধান লক্ষ্য একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা।
সবকিছু নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এগোলে ২৬ সেপ্টেম্বর ভোটের মাধ্যমে বেসিস আবার নির্বাচিত নেতৃত্ব পাবে। এরপর নতুন পর্ষদের সামনে থাকবে দীর্ঘদিনের ক্ষত সারিয়ে সংগঠনের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনা, সদস্যদের আস্থা পুনর্গঠন এবং বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের আন্তর্জাতিক সম্ভাবনাকে আরও জোরালোভাবে সামনে তুলে ধরার বড় দায়িত্ব।
প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি এখন অনেকটাই পরিষ্কার। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কাকে বেছে নেন এবং নির্বাচিত নেতৃত্ব বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে- সেটিই ঠিক করবে বেসিসের হারানো জৌলুস কতটা ফিরে আসে।


