টেকভিশন২৪ ডেস্ক: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দুনিয়ায় ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের আধিপত্য দীর্ঘদিনের। সেই বাস্তবতায় এবার নিজেদের প্রযুক্তি, কনটেন্ট ও ভাবনা নিয়ে নতুন একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চালু হয়েছে রংপুর থেকে। ‘নিজেদের কণ্ঠ, নিজেদের প্ল্যাটফর্ম’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে দেশীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ফ্রিডার’।
উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, ফ্রিডার শুধু সামাজিক যোগাযোগের একটি মাধ্যম নয়; বরং বাংলাদেশিদের নিজেদের গল্প, সংবাদ, মতামত ও সৃজনশীলতা তুলে ধরার একটি দেশীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এতে বন্ধু সংযোগ, সংবাদ ও ভয়েস চ্যানেলের মতো বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
ফ্রিডারের অন্যতম লক্ষ্য স্থানীয় কনটেন্টকে গুরুত্ব দেওয়া। উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তৈরি হওয়া খবর, গল্প, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কনটেন্টও এখানে জায়গা পাবে। এতে জেলা, উপজেলা ও গ্রামের মানুষের নিজস্ব গল্প বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
তরুণ ও কনটেন্ট নির্মাতাদের আকৃষ্ট করতে আয়ের সুযোগও রাখা হয়েছে প্ল্যাটফর্মটিতে। উদ্যোক্তাদের দাবি, এক হাজার অনুসারী হলেই কনটেন্ট নির্মাতারা আয় করার সুযোগ পাবেন। তাঁদের মতে, এতে নতুন নির্মাতাদের জন্য তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যে আয় শুরু করার পথ তৈরি হতে পারে।
ফ্রিডারের প্রতিষ্ঠাতা আখতারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশে দেশীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরির উদ্যোগ অতীতেও নেওয়া হয়েছে। তবে সেসব উদ্যোগ প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যবহারকারীর চাহিদা, নিরাপত্তা, কনটেন্ট ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ফ্রিডার তৈরি করা হয়েছে।
আখতারুজ্জামানের দাবি, যাত্রার শুরুতেই দেশ-বিদেশের প্রায় ১০ হাজার ব্যবহারকারীর আগ্রহ পাওয়া গেছে। তাঁর মতে, রংপুর থেকে এমন একটি প্রযুক্তি উদ্যোগের যাত্রা সহজ নয়। তবে তাঁদের লক্ষ্য শুধু ফেসবুকের বিকল্প তৈরি করা নয়; বাংলাদেশের মেধা ও প্রযুক্তিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা।
তিনি বলেন, বিদেশি প্ল্যাটফর্মে দেশের অর্থ ব্যয় হওয়ার পরিবর্তে দেশীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি অংশ দেশে রাখার সুযোগ তৈরি করতে চান তাঁরা। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কঠিন বলেও স্বীকার করেন তিনি। তাঁর মতে, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ ও আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
ফ্রিডারের হেড অব সাপোর্ট রেজাউল করিম বলেন, ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছে। দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা, তথ্য আদান-প্রদান এবং অশ্লীল ও হেয়প্রতিপন্নকারী কনটেন্ট থেকে ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার বিষয়েও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
ফ্রিডারের বিপণন বিভাগের প্রধান বাদশা আলম বলেন, মানুষের কাছে প্ল্যাটফর্মটির কার্যক্রম পৌঁছে দিতে শুরুতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে একবার যুক্ত হওয়ার পর অনেক ব্যবহারকারীর ধারণা বদলাচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, ১৫০ টাকায় প্রোফাইল তৈরি, ৩০০ টাকায় পেজ যাচাই, স্বল্প খরচে পোস্ট প্রচার ও বিজ্ঞাপন এবং এক হাজার অনুসারী হলেই পেজ থেকে আয় করার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আয় করার জন্য আলাদা করে ফ্রিডারের অ্যাম্বাসেডর কর্মসূচিতেও যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রংপুর নগরের ধাপ এলাকায় ফ্রিডারের কার্যালয়ে বিভিন্ন পদে ১৬ জন কর্মরত আছেন। তাঁদের একজন কনটেন্ট মডারেটর ইশরাত জাহান ইশা। তিনি বলেন, চলতি বছরের ১৫ মে ফ্রিডারের যাত্রার শুরুতে এখানে কাজ করা নিয়ে তাঁর মনে অনিশ্চয়তা ছিল। এখন প্রতিদিন পেজের অনুসারী ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। কাজের চাপও বেড়েছে। একই সঙ্গে তাঁর আয়ের পথও সহজ হয়েছে।
রংপুরের মাটি থেকে জন্ম নেওয়া ফ্রিডার এখন দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে বৈশ্বিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতার একটি উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোর বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দীর্ঘদিনের আস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সহজ নয়। ফ্রিডার সেই প্রতিযোগিতায় কতটা জায়গা করে নিতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ঢাকার বাইরে থেকে এমন একটি প্রযুক্তি উদ্যোগের যাত্রা দেশের প্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনার আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।


