টেকভিশন২৪ ডেস্ক: বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রাণকেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে সফলভাবে সম্পন্ন হলো ‘বিএসআইএ সিলিকন রিভার যুক্তরাষ্ট্র রোডশো ২০২৬’। ৯ থেকে ১২ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই সফরে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী শিল্পের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের এক নতুন অংশীদারিত্বের দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে এই খাতের প্রবাসী বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের দেশে যুক্ত করতে বড় ধরনের সাড়া মিলেছে।
বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআইএ) এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সিলিকন রিভার বাংলাদেশের প্রধান স্থপতি ও পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুস্তাফা হুসেইন। সফরে বাংলাদেশকে একটি ‘উদ্ভাবক জাতি’ হিসেবে গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা হয়।
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি ও যৌথ উদ্যোগ
স্যানডিস্ক: সফরের প্রথম দিন প্রতিনিধিদল স্যানডিস্ক-এর সদর দপ্তর পরিদর্শন করে এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। দীর্ঘ বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগামী পাঁচ বছরের একটি কৌশলগত সহযোগিতার রূপরেখা প্রস্তাব করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, উন্নত মোড়কীকরণ ও পরীক্ষা (অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং ও টেস্টিং), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত অবকাঠামো এবং যৌথ গবেষণা। বৈঠক শেষে এই প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য স্যানডিস্ক কর্তৃপক্ষ একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করেছে।
গ্লোবালফাউন্ড্রিজ: এই শীর্ষস্থানীয় চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠকটি বাংলাদেশের জন্য বড় সাফল্য বয়ে এনেছে। গ্লোবালফাউন্ড্রিজ দুটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রাথমিক সরবরাহকারী (প্রাইমারি ভেন্ডর) হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে একটি ‘উন্নত মোড়কীকরণ নকশা ও গবেষণা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিপ শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে।
সিনোপসিস: প্রযুক্তি খাতের অন্যতম প্রধান এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের ৩,৫০০ প্রকৌশলীকে চিপ ডিজাইন ও প্রযুক্তিতে উন্নত প্রশিক্ষণের বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি বিশ্বমানের ‘উৎপাদন নকশা কিট কেন্দ্র’ (MDK Center) প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে বৈশ্বিক গবেষণা জোটে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে সিনোপসিস।
প্রবাসী প্রযুক্তিবিদ ও বিশ্ববিদ্যলয়ের মেলবন্ধন
সিলিকন ভ্যালির বাইরে স্যাক্রামেন্টো ও ইনটেল করপোরেশনে কর্মরত বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি চিপ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে প্রতিনিধিদলের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রবাসীরা মেধা পাচার রোধ করে উল্টো ‘মেধা ফিরিয়ে আনা’ (ব্রেন গেইন) কর্মসূচির আওতায় মেন্টরশিপ, বিনিয়োগ ও কৌশলগত পরামর্শের মাধ্যমে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করেন।
সফরের শেষভাগে প্রতিনিধিদল বিখ্যাত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির ‘স্কাইডেক’ পরিদর্শন করে। সেখানে বাংলাদেশি উদ্ভাবকদের বৈশ্বিক পুঁজিবাজার ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরতে যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং বিশেষ ‘উদ্ভাবন প্রদর্শনী’ আয়োজনের বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়।
“সিলিকন রিভারই হবে বাংলাদেশের প্রযুক্তি ইঞ্জিন”
১১ জুন রাতে আয়োজিত এক জমকালো নৈশভোজে বৈশ্বিক চিপ শিল্পের শতভাগ শীর্ষ কর্মকর্তা ও প্রবাসী উদ্যোক্তারা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, “প্রবাসীদের মেধা হবে দেশের চিপ শিল্পের মগজ, আর ‘সিলিকন রিভার’ হবে সেই ইঞ্জিন, যা বাংলাদেশকে একটি উদ্ভাবক জাতিতে রূপান্তরিত করবে।”
বিএসআইএ সভাপতি এম এ জব্বার এবং প্রযুক্তিবিদ ড. আনিসুল খান বাংলাদেশের এই দীর্ঘযাত্রার অগ্রগতি ও প্রবাসীদের যুক্ত হওয়ার বিভিন্ন সুযোগের কথা তুলে ধরেন। ড. মুহাম্মদ মুস্তাফা হুসেইন সবাইকে তাত্ত্বিক বিতর্ক ছেড়ে দেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উন্নয়নে বাস্তবমুখী কাজে নামার আহ্বান জানান।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সফরের মাধ্যমে চিপ নকশা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত মোড়কীকরণ প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদার হওয়ার পথ আরও সুগম হলো।



