টেকভিশন২৪ ডেস্ক: আগামী এক দশকের মধ্যে কয়লা, তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ শক্তির উৎস হতে যাচ্ছে সৌরশক্তি বা সোলার। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ব্লুমবার্গএনইএফ’-এর সর্বশেষ এক প্রতিবেদনে এই ঐতিহাসিক পূর্বাভাসের কথা জানানো হয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ডেটা সেন্টারগুলোর বিপুল বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে আরও কয়েক দশক টিকে থাকবে ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানি।
ব্লুমবার্গএনইএফ-এর জ্বালানি অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ম্যাথিয়াস কিমেল টেকক্রাঞ্চকে বলেন, “সৌরশক্তি জ্বালানির এই দৌড়ে জয়ী হতে চলেছে।” তবে এই রূপান্তর কোনো সরকারি কড়াকড়ির কারণে নয়, বরং কেবল অর্থনৈতিক কারণেই ঘটছে; কারণ সৌরবিদ্যুৎ এখন অন্যান্য জ্বালানির চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। উদাহরণস্বরূপ—ইউক্রেন যুদ্ধের পর প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত দুই বছরে পাকিস্তান একাই ২৫ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই প্রযুক্তির পেছনে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। এই এআই মডেলগুলো সচল রাখতে তৈরি হচ্ছে বিশাল সব ডেটা সেন্টার, যার জন্য প্রয়োজন অন্তহীন বিদ্যুৎ।
ব্লুমবার্গএনইএফ-এর হিসাব অনুযায়ী, এই ডেটা সেন্টারগুলোর কারণে গ্রিড লাইনে অতিরিক্ত ১ টেরাওয়াট এবং ছাদে আরও ৪০০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, সৌরবিদ্যুৎ দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায় না। আর এখানেই দরকার পড়ছে কয়লা ও গ্যাসের। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল পর্যন্ত ডেটা সেন্টারগুলোর বাড়তি চাহিদার প্রায় ৫১ শতাংশ বিদ্যুৎ আসবে কয়লা (১১০ গিগাওয়াট) ও প্রাকৃতিক গ্যাস (৩৭০ গিগাওয়াট) থেকে। ফলে এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানিকে টিকিয়ে রাখবে।
সৌরবিদ্যুতের এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো এখন দীর্ঘমেয়াদি ব্যাটারি স্টোরেজ, ভূ-তাপীয় (Geothermal) এবং পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে। সম্প্রতি গুগল তাদের একটি ডেটা সেন্টার প্রজেক্টে ‘ফর্ম এনার্জি’ নামক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১০০ ঘণ্টা ব্যাকআপ দিতে সক্ষম এমন ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার মূল্যের বিশাল ব্যাটারি সিস্টেম যুক্ত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ব্যাটারির বাজার ঠিক সেই অবস্থানে রয়েছে, যেখানে ২০২০ সালে সৌরশক্তি ছিল। গত বছর বিশ্বজুড়ে ১১২ গিগাওয়াট গ্রিড-স্কেল ব্যাটারি স্থাপন করা হয়েছে, যা ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় তিন গুণ হবে। স্পেন ও ইতালির মতো দেশগুলোতে দিনের বেলা সৌরবিদ্যুতের উদ্বৃত্ত থাকায় দাম অনেক কমে গেছে। ফলে উৎপাদকেরা এখন সোলার প্যানেলের সাথে ব্যাটারি যুক্ত করে ‘হাইব্রিড প্ল্যান্ট’ তৈরি করছেন, যাতে দিনের বিদ্যুৎ রাতে চড়া দামে বিক্রি করা যায়।
সৌরবিদ্যুতের এই জয়জয়কারের পেছনে মূল অবদান চীনের শিল্পনীতি, যা উৎপাদকদের বিপুল ভর্তুকি দিয়ে বিশ্ববাজার সস্তা প্যানেলে সয়লাব করে দিয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে সোলার প্যানেলের দাম আরও ৩০ শতাংশ কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলমান ইরান সংকটের মতো ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিকে মেঘাচ্ছন্ন করলেও, সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই রূপান্তর যেকোনো দেশের জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাবে। ম্যাথিয়াস কিমেল বলেন, “এই রূপান্তর কেবল সাশ্রয়ীই নয়, বরং যেকোনো দেশের জ্বালানি স্বাধীনতার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।”



